‘ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন/যদিও পৃথক হয় ভটভটির কারণ’- কুকুরছানাটি তাঁর ভাইয়ের কানে কানে হয়তো এই কথাটি বলছিল। পশুপাখিরা কথা বলতে পারেনা ঠিকই- আচরণের মাধ্যমে তাঁদের আনন্দ-দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ করে।
এমনি এক কুকুর ছানার ভালোবাসা ও মমত্ববোধ দেখলো নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা গ্রামের নিমতলা বাজারের মানুষজন।
গতকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেলে ওই বাজারে একটি কুকুর ছানা ভ্যানের চাপায় মারা যাওয়ায় সহদোর কুকুর ছানাকে এইভাবে শোক প্রকাশ করতে দেখা গেল।
নিমতলা বাজার এলাকার ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাস খানেক আগে একটি মা কুকুর দুটি ছানার জন্ম দেয়। ছানা দুটি বাজারেই থাকতো। একসঙ্গে ঘোরাফেরা করতো। গতকাল রাস্তা পার হচ্ছিল একটি ছানা। এসময় একটি একটি ভ্যান বাচ্চাটিকে চাপা দেয়। এতে মারা যায় সে। একজন পথচারী মৃত ছানাটিকে রাস্তার পাশে রেখে দেয়।
গতকাল সন্ধ্যার দিকে গিয়ে দেখা যায়, মৃত ছানাটির পাশে আরেক ছানা দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরপর অদূরে চলে যাচ্ছিল। আবার কাছে আসছিল। মৃত ছানাটির কান ধরে টানছিল, মুখ শুঁকছিল, ঘেউ ঘেউ করছিল। বাজারের মুদি দোকানি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘বেশ কয়েক দিন থেকে আমার দোকানের আশেপাশে ছানা দুটি ঘোরাফেরা করছিল। গতকাল দুপুরেই দোকানের পাশে অনেকক্ষণ শুয়েছিল। একটি মারা যাওয়ায় আরেকটি একা হয়ে গেল।
বাজার সংলগ্ন বাসিন্দা গোপাল চন্দ্র বলেন, ‘সন্ধ্যাবেলা দেখতাম আমার খলিয়ানে খড়ের ভিতরে ছানা দুটি নিয়ে মা কুকুরটি শুয়ে থাকতো। সকাল হলে খাবারের খোঁজে বের যেতো। মাঝেমধ্যে এসে ছানা দুটিকে দুধ খাইয়ে যেত। আমি কয়েকদিন খাবারও দিয়েছি। মারা যাওয়াতে খুব খারাপ লাগছে।
চা স্টল দোকানি রকি প্রামানিক বলেন, বাচ্চা দুটি প্রায়ই তাঁর দোকানে ঘোরাঘুরি করতো। বেশ কয়েকদিন তিনি খাবারও দিয়েছেন।
গৃহবধূ বেবি রানী বলেন, গতকাল দুপুরেই তাঁর ছোট মেয়েটি ছানা দুটি দেখে ধরার জন্য ছুটে যাচ্ছিল। মেয়ে বলছিল, ছানা দুটিকে বাড়িতে নিয়ে আসবে। বিকেলে শুনেছেন একটি ছানা মারা গেছে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুপ কুমার জানালো, ‘আমি বেশ কিছুদিন ছানা দুটিকে রাস্তার পাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখে দূরে রেখে এসেছিলাম। আবার দেখি রাস্তার পাশেই ঘুরছে। একে তো অবলা জীব, তার উপর ছোট ছানা। নিজের বিপদটা হয়তো বুঝতে পারেনি।
গ্রামের বাসিন্দা ও শিক্ষক শ্যামল চন্দ্র বলেন, ‘ভালোবাসার কাছে মানুষ আর পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। একজনের মৃত্যুতে আরেকজনও ব্যথিত হয় সেটা একটা পশুর মধ্যেও আমরা সেটার প্রতিফলন দেখলাম।