“গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’/ সুন্দর হল সে।” কবিগুরুর কবিতার মতোই দুলাল মালাকারের হাতের সুনিপুণ ছোঁয়ায় শোলার তৈরি গোলাপ হয়ে উঠে সুন্দর। শাপলা আর কদম প্রস্ফুটিত হয়ে ছড়ায় সৌন্দর্য । এই ফুলগুলো ফোটাতে গিয়ে হারিয়েছেন বাম হাতের একটি আঙুল। তবে হাল ছাড়েননি। এখন ফুলগুলোই তাঁর জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। চল্লিশ বছর ধরে এভাবেই ‘ঝরা-কদমের’ কাব্য রচনা করে যাচ্ছেন। তবে প্রাপ্তির সাথে রয়েছে বেদনার গোপন আখ্যান।
বাপ-দাদার কাছ থেকে শোলার বিভিন্ন শিল্পকর্ম তৈরি করা শিখেছেন দুলাল মালাকার। এতেই চলে সংসার। তবে জীবিকার চাইতেও এই শোলার সাথে মিশে রয়েছে এক অকৃত্রিম ভালোবাসা। প্রগাঢ় প্রেম। দুলাল মালাকারের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার একডালা গ্রামে।
সম্প্রতি তিনি জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার ভাবিচা গ্রামে ‘ঝরা’ আর ‘কদম’ ফুল বিক্রি করতে এসেছিলেন। সেখানেই তাঁর সাথে কথা হয়।
আলাপচারিতায় জানালেন, চল্লিশ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। নিয়ামতপুরে আসেন ২২ বছর ধরে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পৌষ পার্বণ উপলক্ষে ‘ঝরা’ আর ‘কদম’ ফুল বিক্রি করতে এসেছেন। এগুলো এই এলাকায় ‘পুষনার ফুল’ নামে পরিচিত। আলাপচারিতার মাঝেই ফুল বিক্রি করছেন তিনি।
ফুল কিনলেন জীবন প্রামানিক। তিনি বললেন, পৌষ পার্বণের দিনে ধর্মীয় রীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী মঙ্গল কামনায় এই ফুল বাড়িতে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঝুলানো হয়। একটি ছোট কদম পাঁচ টাকা, একটি বড় কদম ৩০ টাকা আর ১০টা ঝরা কিনলেন পাঁচ টাকায়।
দুলাল মালাকার কথায় কথায় জানালেন, পৌষ পার্বণ উপলক্ষে এবারে প্রায় আট হাজার কদম ফুল বানিয়েছেন । চার হাজার পাইকারী বিক্রি করেছেন। সেই ফুলগুলো কিনেছেন পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা। আর বাকি চার হাজার ফুল নিজে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করছেন। ১০ দিনে ১০টি গ্রামে হেঁটে হেঁটেই বিক্রি করবেন এই ফুল।
আলাপচারিতায় আরও জানালেন, তিন মাস আগে থেকে এই ফুল তৈরি শুরু করেছিলেন। সারাদিনে প্রায় ২০০ কদম ফুল তৈরি করতে পারেন। একাজে তাঁর মা, স্ত্রী ও ছেলে সাহায্য করেন। শোলাগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করেন। জানতে চাইলে বলেন, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার খেতুরী মেলা থেকে কিনতে হয় এই শোলা। এক বছরের জন্য কিনে নেন তিনি।
পুষনার ফুলের পাশাপাশি শোলা দিয়ে বিয়ের জন্য বর-বৌয়ের টোপর, যাঁতি, মালা, বিভিন্ন পাখি- বক, ময়ূর, টিয়া, জাগরের ফুলসহ আরও কিছু শৌখিন দ্রব্য তৈরি করেন। সেগুলো কিছু অর্ডার দিয়ে বাড়ি থেকেই কিনে নিয়ে যান ক্রেতারা। কিছু বিভিন্ন মেলায় দোকান দিয়ে বিক্রি করেন। বাকিগুলো গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেন।
দুলাল মালাকারের তিন মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে কৃষিকাজ করে। ছেলেকেও শিখিয়েছেন এই কাজ। তাঁর অবর্তমানে ছেলেই বাঁচিয়ে রাখবে এই শিল্পকর্মকে। আপনার বয়স কত জিজ্ঞেস করলে একগাল হেসে বললেন, ‘কিছু চুল পাকিছে। কিছু কালো আছে। কয়েকপা দাঁতও লড়বড় করিচ্ছে। এখন বুঝো তালে বয়স কত। আন্দাজ করে ল্যাখা দাও।
এক্ষণে গল্পের রাশ টানতে হলো। দুলাল মালাকারকে আরও অনেক বাড়িতে ফুল পৌঁছাতে হবে। যাবার আগে বললেন, ‘একটা ফুল তৈরি করতে ম্যালা খাটনি করতে হয়। শোলা সাইজ করা, কাটা, রং লাগানো, সুতা পরানোসহ অনেক কাজ। এতো খ্যাটাখাটনি কর্যা ট্যাকা (ন্যায্য মূল্য)পাওয়া যায় না। তার উপর বয়সও হছে। হ্যাঁটা হ্যাঁটা গাঁয়োত ঘুরতে কষ্ট হয়। পাও ব্যাদনা করে।’
তাঁর শত কষ্টের মাঝেও এই শিল্পটা টিকে থাকুক। এটাই তাঁর চাওয়া।