ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের রাঙ্গামুলা কান্দি গ্রামে ঘটে গেছে এক হৃদয়বিদারক ও চাঞ্চল্যকর মানবপাচারের ঘটনা, যা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন ফারুক মোল্লা নামের এক অসহায় পিতা। ছেলেকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনলেও এখন উল্টো মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি ও তার নিরীহ স্বজনরা।শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফারুক মোল্লা তার এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন এবং দোষীদের বিচার দাবি করেন।
ফারুক মোল্লার অভিযোগ, একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ মল্লিকের ছেলে মনির মল্লিক দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ায় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে সহজ-সরল মানুষদের ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়, এরপর অবৈধ পথে ইউরোপে পাচারের কথা বলা হয়।
এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি ফারুক মোল্লার ছেলে জিহাদ মোল্লাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। এ জন্য দেশে থাকা মনিরের স্ত্রী আসমা বেগমের কাছে ১৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইতালি পাঠানোর পরিবর্তে জিহাদকে লিবিয়ায় অল্প মজুরিতে কঠোর শ্রমে বাধ্য করা হয়।
পরবর্তীতে ইতালিতে পাঠানোর জন্য চাপ দিলে জিহাদের জীবনে নেমে আসে বিভীষিকা। অভিযোগ অনুযায়ী, মনির মল্লিক তাকে লিবিয়ার এক মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে জিহাদকে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়—হাত-পা বেঁধে, মুখ বন্ধ করে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পরিবারকে পাঠিয়ে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
অসহায় পরিবার শেষ পর্যন্ত ১২ লাখ টাকা জোগাড় করে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি জিহাদকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। তবে ততদিনে জিহাদ গুরুতরভাবে আহত ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছে।
এই নির্মম নির্যাতনের ভিডিও এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপর ফারুক মোল্লা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে টাকা ফেরত ও বিচার চেয়ে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু বিচার পাওয়ার বদলে উল্টো মিথ্যা লুটপাট মামলায় ফাঁসিয়ে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফারুক মোল্লা বলেন,
“আমার ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে আমি সব হারিয়েছি। এখন আমি নিঃস্ব, দেনায় জর্জরিত। তার উপর আবার মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমি রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চাই।
এসময় উপস্থিত ছিলেন একই চক্রের হাতে পূর্বে নির্যাতিত শরীফ মোল্লা, হাসান শেখ, সুদেব বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী। তারা সকলেই এই মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এ ঘটনায় এলাকাবাসী দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন