মাস পাঁচেক আগে এক চোখে আঘাত পেয়েছিলেন মো. রেজাউল আলম। হাটে যাওয়ার আগে মেয়ের কাছ থেকে চোখে ড্রপ দিয়ে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, রাতে ফিরে এসে আবার দিবেন। সেই ড্রপ আর চোখে দেওয়া হয়নি। সবাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
রেজাউল আলম (৬৫) গরু ব্যবসায়ী ছিলেন। এলাকায় গরু কিনে বিভিন্ন হাটে বিক্রি করতেন। গত ১৮ জানুয়ারি অন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ভুটভুটিতে(শ্যালো মেশিন চালিত তিন চাকার যান) চড়ে গরু নিয়ে রাজশাহীর সিটি হাটে যাচ্ছিলেন।
যাবার পথে বেপরোয়া গতির কারণে ভুটভুটি চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাককে ধাক্কা মারে। নিহত হন রেজাউল আলম। আহত হন আরও তিনজন।
গতকাল রোববার (২৫ জানুয়ারি) নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রাউতাড়া গ্রামে গিয়ে পরিবারের লোকজনের স্বজন হারানোর শোকার্ত মুখচ্ছবি দেখা গেল। রেজাউল আলমের ছেলে নেই। চার মেয়ে। সব মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মেজো মেয়ে শাহনাজ পারভীন বিয়ের পরে বাবার বাড়িতেই থাকেন। চোখ মুছতে মুছতে বললেন, পাঁচ মাস আগে হাটোত যাবার ল্যাগা আব্বার এক চোখোত গাছের ডালের বাড়ি লাগিছিলো। সেই থ্যাকা চোখে ভালো দেখিচ্ছিল না।
চোখোত ড্রপ দিচ্ছিলো। সেদিন (১৮ জানুয়ারি) হাটোত যাওয়ার আগে আমার কাছ থেকে চোখোত ড্রপ দিয়া লিলো। খাওয়ার ওষুধ ফুরা গেছিলো। আব্বা আসার সময় ওষুধ কিনা লিয়া আসপ্যার চাছিলো৷ ওষুধও আসেনি। হামার আব্বাও ‘আসেনি।
স্বামীকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল রাশেদা বিবি কোনো কথাই বলতে পারলেন না। ছলছল চোখে এই প্রতিবেদকের মুখে দিকে শুধু তাকিয়ে থাকলেন।
মেজো জামাই ইমরুল ইসলামকে গরুর ব্যবসা শিখিয়েছিলেন রেজাউল আলম। জামাই-শ্বশুর একসঙ্গে হাটে যেতেন। ঘটনার দিনও যাচ্ছিলেন। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইমরুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন আমি ভুটভুটির পিছনে বসেছিলাম। আমার শ্বশুর ড্রাইভারের বামপাশে বসেছিল। রাজশাহীর নওহাটা পার হওয়ার পর চালক প্রচন্ড গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আবার সবাই ধীরে চালাতে বলছিলাম। ড্রাইভার আমাদের কথা শোনেননি। পবা উপজেলা পরিষদের কাছে গিয়ে রাস্তার বামপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। আমার শ্বশুরসহ চারজন আহত হন। তাঁকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে গরুগুলো বাড়িতে ফেরত আনা হয়।
চালকের বেপরোয়া গতির কারণে ২০২৪ সালের ৮ জুলাই উপজেলার সাংশৈল এলাকায় ভুটভুটি উল্টে দুই গরু ব্যবসায়ী নিহত হয়। আহত হয়েছিল অন্তত ১০জন। এছাড়াও মাঝেমধ্যে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার গরু ব্যবসায়ীরা ভুটভুটিতে করে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া, চৌবাড়িয়া; চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার সোনাইচন্ডী ও রাজশাহীর সিটি হাটে গরু নিয়ে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী জানান, জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভুটভুটিতে চড়ে বিভিন্ন হাটে যাতায়াত করতে হয়।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) নওগাঁ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. রাশেদ্দুজামান বলেন, শ্যালো মেশিন চালিত তিন চাকার ভুটভুটির কোনো অনুমোদন নেই, রুট পারমিটও নেই। মহাসড়কে এদের চলাচল বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এছাড়াও বিভিন্নভাবে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।