ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে এখন বইছে নির্বাচনি আমেজ। ভোট গ্রহণের আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা যেমন তুঙ্গে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাড়ছে আগ্রহ ও প্রত্যাশা। গ্রাম থেকে মফস্বল, মফস্বল থেকে শহর—সবখানেই বিরাজ করছে এক ভিন্নধর্মী নির্বাচনি পরিবেশ।
৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংসদীয় আসন-২৫ (কুড়িগ্রাম–১) এর অন্তর্ভুক্ত ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী ও কচাকাটা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের মোড়ের চায়ের দোকানগুলোতে জমতে শুরু করে আড্ডা। সারাদিন মাঠে-ঘাটে কাজ করা কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, দোকান কর্মচারী—সবাই ক্লান্তি ঝেড়ে সন্ধ্যায় জড়ো হন এসব দোকানে।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে কুশল বিনিময়। কেউ টেলিভিশনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ দেখছেন, কেউবা মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে দেখছেন নির্বাচনি আপডেট। আর এর মাঝেই শুরু হয় প্রাণবন্ত আলোচনা—কে এগিয়ে, কার অবস্থান শক্ত, কার প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত, কাকে ভোট দিলে এলাকার উন্নয়ন হবে—এসব নিয়েই তর্ক-বিতর্ক।
স্থানীয় এক চা-দোকানি বলেন, “নির্বাচন আসলেই দোকানে ভিড় বেড়ে যায়। সবাই চা খেতে খেতে রাজনীতি নিয়ে কথা বলে। কখনো কখনো তর্কও হয়, তবে শেষে আবার হাসাহাসি করে বাড়ি যায়।”
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এখন প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। কেউ উন্নয়নকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, কেউ স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আবার কেউ জাতীয় রাজনীতির প্রভাব বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
অনেকের মতে, গ্রামীণ জনপদে চায়ের দোকানই এখন তথ্য বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম। যেখানে বড় কোনো সভা-সমাবেশ নেই, সেখানে এসব দোকানই হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের উন্মুক্ত মঞ্চ। স্থানীয়দের ভাষায়, “চায়ের দোকান মানেই ছোট সংসদ।” এখানে দল-মত নির্বিশেষে সবাই নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এসব দোকানে বসে দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়। কেউ বিশ্লেষণ করেন জাতীয় ইস্যু, কেউ তুলে ধরেন এলাকার সড়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি সংক্রান্ত সমস্যা। এভাবেই চায়ের কাপে চুমুকের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে জনমত।
এদিকে, কুড়িগ্রাম–১ সংসদীয় আসনে মোট ২২৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ৫ লাখ ৬০ হাজার ২৪৫ জন ভোটার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫৭৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৮১ হাজার ৬৬৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩ জন। ভোটার সংখ্যার দিক থেকে আসনটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় প্রার্থীরাও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ভোট যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনি উত্তাপ। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা—সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। চায়ের দোকানের এই আলোচনাই হয়তো শেষ পর্যন্ত প্রতিফলিত হবে ব্যালট বাক্সে।
এখন দেখার বিষয়, ভূরুঙ্গামারীর চায়ের আড্ডায় যে ভোট-সমীকরণ ঘুরপাক খাচ্ছে, তা কতটা বাস্তব রূপ পায় নির্বাচনের ফলাফল।