সরবরাহ লাইনে গ্যাস সংকটে গাজীপুরের শিল্পকারখানায় পণ্য উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে। দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় বেকার বসে থাকতে হচ্ছে শ্রমিকদের। এ অবস্থায় রপ্তানীমুখী পোশাক খাত লোকসানের মুখে পড়েছে। বেতন ভাতা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন শ্রমিকরা। দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে মালিক, শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় লম্বা লাইন দেখা গেছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে।
শিল্প উদ্যোক্তা ও কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছেন, দ্রুত এই জ্বালানি সংকট সমাধান করা না হলে কার্যাদেশ বাতিলসহ অনেক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে পড়বে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শিল্প অধ্যূষিত গাজীপুরে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সরবরাহ লাইনে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। কারখানাগুলোতে প্রতি বর্গফুটে যেখানে গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই থাকার কথা সেখানে মিলছে মাত্র দুই থেকে তিন পিএসআই। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমে নেমে এসেছে অর্ধেকে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় একদিকে রয়েছে কারখানা বন্ধের ঝুঁকি, অন্যদিকে বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় শ্রমিকেরা। এছাড়া গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে গাড়ির লম্বা লাইন। কাঙ্ক্ষিত চাপ না থাকায় অনেক ফিলিং স্টেশনে গাড়িতে জ্বালানি নিতে পারছেন না চালকরা। ফলে সংকট দেখা দিয়েছে পরিবহন খাতেও।
শ্রমিকরা বলছেন, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় মেশিন পত্র চলে না। তাই দিনের বেশিরভাগ সময় বেকার বসে থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ঈদে বেতন ভাতা পরিশোধ নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা।
মৌচাক এলাকার সাদমা গ্রুপ কারখানায় কর্মরত এক শ্রমিক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে এই কারখানায় কয়েক লাইনের মেশিন বন্ধ রয়েছে। এতে তারা কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন করতে পারছেন না।
বিভিন্ন কারখানার মালিক ও কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক দিন ধরেই গ্যাসের সংকট। দিন দিন তা তীব্র হয়ে উঠেছে। এছাড়া দিনের বেশির ভাগ সময়ই গ্যাসের চাপ কম থাকায় মেশিন পত্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে কারখানায় উৎপাদন কমেছে ৫০ ভাগ। এছাড়া সময় মত পণ্য উৎপাদন না হওয়ায় বায়ারদের কার্যাদেশ বাতিলসহ অনেক লাইন বন্ধ হয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে সাদমা গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশল মইনুল ইসলাম পলাশ বলেন, গত বেশ কিছুদিন ধরে কারখানায় তারা গ্যাস পাচ্ছেন না। মেশিন পত্র চালানোর জন্য কমপক্ষে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু লাইনে পাওয়া যায় ১-২ পিএসআই গ্যাস। ফলে কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এছাড়া সময়মতো শিপম্যান্ট না হওয়ায় বায়ারদের কার্যাদেশ বাতিলসহ নানা ধরনের জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।
পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর এক তথ্য অনুযায়ী, শুধু গাজীপুরেই কারখানায় গ্যাস সংকটে থাকায় শত শত কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে মালিকদের। এছাড়া অনেক কারখানা বন্ধ রয়েছে। তাই সরকারের কাছে জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান চাইছেন কারখানা মালিকরা।
এ ব্যাপারে স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে মালিকদের শত শত কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনিভাবে বায়াররা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন। এতে তৈরি পোশাক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আমরা চাই, দ্রুত গ্যাস সংকট দূর করা হোক। এছাড়া জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন করে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শুধু শিল্প কারখানায় নয়, গ্যাস সংকটে ভুগছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি নিতে পারছেন না পরিবহন চালকরা।
গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট, অর্ধেকে নেমে এসেছে শিল্প উৎপাদন
এ ব্যাপারে নাওজোড় এলাকায় একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে কথা হয় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আবুল কাশেমের সঙ্গে। তিনি বলেন, সকালে ৩শ টাকার গ্যাস নেওয়ার জন্য পাম্পে এসেছেন। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে গেলে চাপ না থাকায় মাত্র দেড়শত টাকার গ্যাস নিতে পেরেছেন তিনি।
গাজীপুরে ৫ হাজারের বেশি কলকারখানা রয়েছে, যার বেশিরভাগই গ্যাস নির্ভর। আর এ খাতে কাজ করছেন অন্তত ২২ লাখ শ্রমিক। প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না পেলে সংকট আরও বাড়বে বলে শঙ্কা মালিক, শ্রমিক ও পোশাক ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের।